বাংলাদেশের সব জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ জন্য নির্বাচনী আইন আরপিও (Representation of the People Order) সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধনী অনুমোদিত হলে সেনা সদস্যরা কেবল স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবেই নয়, পূর্ণাঙ্গভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
সেনাবাহিনীকে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেন—
“আমরা আরপিও সংশোধন করে সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করেছি। আগে শুধু পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ছিল। এবার সেনাবাহিনীও যুক্ত হলো। প্রস্তাবটি এ সপ্তাহেই সরকারের কাছে পাঠানো হবে।”
এর ফলে সেনাবাহিনীকে মোতায়েনের ক্ষেত্রে আর সরকারের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হবে না। নির্বাচন কমিশন সরাসরি সেনাসদর দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় বাহিনী চাইতে পারবে।
অতীতের প্রেক্ষাপট
২০০১ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রথমবার আরপিওতে সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তখন থেকে তারা নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি ও পুলিশি ক্ষমতা পেত। তবে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার সেই বিধান বাতিল করে সেনাবাহিনীকে বাদ দেয়। ফলে এরপর থেকে তারা শুধু সহায়ক বাহিনী বা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল।
নতুন প্রস্তাবের প্রভাব
সংশোধনী কার্যকর হলে সেনা সদস্যরা নির্বাচনের সময় গ্রেপ্তার, আইন প্রয়োগ ও ডেপ্লয়মেন্টে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আগে কোনো পদক্ষেপ নিতে হলে তাদের ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিতে হতো।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন—
“এখন আর সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। তারা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। এতে ভোটে প্রভাব বিস্তার কঠিন হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন—
“বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেনাবাহিনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। পুলিশ আগের নির্বাচনে আস্থা হারিয়েছে। তাই সেনাবাহিনীকে পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ।”
সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচনে ৮০ হাজারের বেশি সেনা সদস্য মোতায়েন করা হবে। এছাড়া প্রায় দেড় লাখ পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও আনসারও দায়িত্ব পালন করবে।
আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সেনাবাহিনীকে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা দিয়ে দায়িত্ব দিলে ভোটারদের আস্থা ফিরে আসবে। নির্বাচন কমিশনের মতে, জাতীয় নির্বাচন হোক বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশ হয়ে কাজ করবে।
ইসি মাছউদ বলেন—
“মানুষের মনে নির্বাচনের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাই শুধু জাতীয় নয়, সব নির্বাচনেই সেনাবাহিনী থাকবে। এখন থেকে এটা সরকারের ইচ্ছাধীন নয়, আইনের অধীন হবে।”